1. admin@dailyfulbariasangbad.com : admin :
শুক্রবার, ২১ জুন ২০২৪, ০৪:১৮ অপরাহ্ন

শূণ্য থেকে কোটিপতি! ৩০ হাজার লোকের ভরসা বাদশা মিয়া

  • প্রকাশের সময় : বুধবার, ৩০ আগস্ট, ২০২৩
  • ১১৮ বার পঠিত

মোঃ সাবিউদ্দিন: স্বাধীনতার পর পঞ্চাশ বছরে দেশের অর্থনীতিতে ঈর্ষণীয় সাফল্য এসেছে। অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকগুলোতে প্রতিযোগীদের পেছনে ফেলে সামনের সারিতে বাংলাদেশ। এই সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছে প্রায় ৫০ চালিকাশক্তি। বড় ঝুঁকি নিয়ে অভিনব পথে এগিয়ে গেছেন আমাদের সাহসী উদ্যোক্তারা। তাদের জাদুর বক্সে চমকে দিচ্ছে সারা বিশ্বকে। দেশের অর্থনীতির অগ্রনায়করা বিশ্বে মর্যাদার আসনে বসেছেন। বাংলাদেশের অর্থনীতির এক চালিকাশক্তির নাম বাদশা মিয়া। দেশের বস্ত্র খাতের শীর্ষ রপ্তানিকারকদের একজন বাদশা মিয়া। বংশগত বাদশা নন, কেবল নামে মাত্র বাদশা মিয়া। কিন্তু নিজের অক্লান্তু পরিশ্রমে আজ শুধু নামে বাদশা নয় বাস্তবেও বাদশা হয়েছেন। মাত্র ৪৭ বছরে গড়ে তুলেছেন বাদশা টেক্সটাইল, কামাল ইয়ার্ন, পাইওনিয়ার নিটওয়্যার ও পাইওনিয়ার ডেনিম নামের চারটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান। যেখানে ৩০ হাজার শ্রমিক কাজ করছে। এক সময় ১০টাকা নিয়ে বাড়ি ছাড়লেও আজ তার বার্ষিক লেনদেন ৪০ কোটি ডলারের বেশি, যা দেশীয় মুদ্রায় ৩ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। তার অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ টানা পাঁচবার রপ্তানি ট্রফিও তুলে নিয়েছেন নিজ হাতে। রাজ প্রসাদ থাকলেই বাদশা হতে হবে এমনটা নয়। একসময় নামে বাদশা হিসেবে পরিচিত ছিল বাদশা মিয়া। মাদারীপুরের শিবচর এলাকার এক হতদরিদ্র বাবার সন্তান বাদশা মিয়া। পারিবারিক আর্থিক অনটনের মধ্যে থাকা বাদশা মিয়া উচ্চ শিক্ষার আলো দেখতে পারেনি। পরিবারের হাল ধরতে মাত্র ১৪ বছর বয়সে বাবার কাছ থেকে ১০টাকা নিয়ে পাড়ি জমায় রাজধানী ঢাকায়। ১৯৭৫ সালে মাদারিপুর থেকে লঞ্চে চড়ে এলাকার পরিচিত এক বড় ভাইয়ের খোঁজে আসে নারায়ণগঞ্জের কাঠপট্টি এলাকায়। সেখান থেকে ঢাকার টানবাজারে আসেন পায়ে হেঁটে। টানবাজারের সুতার গতিতে খুঁজে পেলেন এলাকার এক ভাইকে। এরপর পরিচিত ভাইয়ের মাধ্যমে নেমে পড়েন ব্যবসায়। রব ভূঁইয়ার গদি থেকে এক বান্ডিল সুতা বাকিতে কিনে এক ক্রেতার কাছে বিক্রি করলেন। তাতে লাভ হলো ৪ টাকা। এভাবেই এগুতে থাকেন বাদশা মিয়া। ১০টাকা হাতে নিয়ে বাড়ি থেকে বের হওয়া বাদশা মিয়া আজ দেশের বস্ত্র খাতের শীর্ষ রপ্তানিকারকদের একজন। হার না মানা পরিশ্রমকে কাজে লাগাতে থাকেন বাদশা মিয়া। ওই সময় সুতা বেচাকেনা বলতে ছিল দালালি প্রথা। এক দোকানের সুতা অন্য দোকান বা ক্রেতার কাছে বিক্রি করে কমিশন নেওয়া হতো। বাদশা মিয়াও পিছিয়ে থাকলেন না। প্রথম দিকে তিনিও সুতা বেচাকেনার দালালি করতে থাকলেন। এর থেকে ভালো উপার্যন করতে লাগলেন। একসময় পরিচয় হলো গাজীপুরের কাশেম কটন মিলের নির্বাহী পরিচালক মঈনুল ইসলাম নামক এক ব্যবসায়ীর সাথে। বিশ্বাস আর আস্থা অর্জন করায় বাদশা মিয়াকে সুতা বরাদ্দ দিতেন মঈনুল ইসলাম। সুতা নিয়ে নারায়ণগঞ্জে এনে ব্যবসা করতে বাদশা মিয়া। তৎকালীন সময়ে যানবাহন কম থাকায় বাদশা মিয়া সুতা নিয়ে কখনো গরুর গাড়িতে কখনো বাসে আবার কখনো পায়ে হেটে চলাচল করতেন। এক কথায় কলুর বলদের মত হারভাঙ্গা পরিশ্রম ছিল তার। সুতা নিয়ে বিভিন্ন হাটে হাটে বিক্রি করতেন। ১৯৭৬ সালে পাইকারি সুতা বিক্রির লাইসেন্স করেন বাদশা মিয়া। টানবাজারে ভাড়ায় গদি নেন এবং কয়েক মাসের ব্যবধানে ভালো একটি জায়গায় সেটিকে স্থানান্তর করেন। তখন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস করপোরেশনের (বিটিএমসি) আশরাফ, জিনাত, মন্নু, অলিম্পিয়া, কাদেরিয়াসহ কয়েকটি বস্ত্রকল থেকে সরাসরি সুতা কিনে পাইকারি ও খুচরা বিক্রি শুরু করেন। তবে তার এ ব্যবসা বেশিদিন করতে হয়নি। মাত্র ৬বছরেই হয়ে যান কোটিপতি। তার আস্থা, বিশ্বাস আর ভালোবাসায় ১৯৮৩ সালে একসঙ্গে চার-পাঁচটি বস্ত্রকলের সুতা বিক্রির একক এজেন্ট হন। এজেন্ট হওয়ার পর ব্যবসা আরও দ্রুত বাড়তে থাকে তার। অভাবের তাড়নায় ছুটে আসা বাদশা মিয়াকে আর পিছনে থাকাতে হয়নি। দারিদ্রের কাছ হার মানতে হয়নি। নামে বাদশা নয় রূপ নেয় বাস্তবে এক বাদশা মিয়ার।

পরের বছর অবশ্য এর আগে সুতা আমদানিতে হাত পাকান বাদশা মিয়া। ধীরে ধীরে টানবাজারের ‘বাদশা’ অর্থাৎ বড় ব্যবসায়ী হয়ে ওঠেন বাদশা মিয়া। আসমা বেগমকে বিয়ে করেন। নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়ায় নিজের বাড়ি নির্মাণ হয়ে গেছে। টানা দুবার টানবাজারের সুতা ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন তিনি।

এবার বাদশা মিয়া স্বপ্ন দেখেন বস্ত্রকল স্থাপন করার। লক্ষ্য ঠিক রেখে আবারও এগুতে থাকে বাদশা মিয়া। ১৯৮৫ সালে ভাইদের নিজের ব্যবসায় নিয়ে আসেন। তখন কিছুটা স্থির হন বাদশা মিয়া। এরপর ভারত থেকে তুলা আমদানি শুরু করেন। এরইমধ্যে নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়ায় নির্মাণ করেন নিজের নামে বাড়ি। নারায়নগঞ্জের টানবাজারের ‘বাদশা’ নামে পরিচিত হয়ে উঠেন। এক সময় বাদশা মিয়া বড় ব্যবসায়ী হয়ে ওঠেন ওই এলাকায়। ওই সময়ে বাদশা মিয়া টানা দুবার টানবাজারের সুতা ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। ১৯৮৬ সালে নারায়ণগঞ্জের পঞ্চবটীতে নিজের নামে ক্রয় করেন জমি। সেই জমিতে পোশাক কারখানা করার পরিকল্পনা করেন বাদশা মিয়া। মেশিনপত্রও কিনে আনেন। শেষ পর্যন্ত সাহস করলেন না। মেশিনপত্র দিলেন বিক্রি করে। আবার দোকানদারিতেই মনোযোগ দিলেন। পরে অবশ্য সেখানে টুস্টিং কারখানা- মানে সুতা ডাবলিং বা মোটা করার কারখানা দেন। চাদর বুনতে সেই টুস্টিং সুতার ছিল বেশ কদর। ১৯৯৭ সালে স্কয়ার টেক্সটাইলের সুতার এজেন্ট হিসেবে ঢাকায় আসেন পাকাপাকিভাবে। তার সূত্র ধরেই ১৯৯৯ সালে নারায়ণগঞ্জের পঞ্চবটীতে ৪০০ মেশিন দিয়ে সোয়েটার কারখানা স্থাপন করেন। সুতার ব্যবসা থেকে পোশাকশিল্পের পেছনে ছুটেন বাদশা মিয়া। ২০০৩ সালে ভালুকায় ১০০ বিঘা জমির ওপর বস্ত্রকল শুরু করেন। নারায়ণগঞ্জের পঞ্চবটীতে থাকা সোয়েটার কারখানা এসময় ভালুকায় স্থানান্তরিত করা হয়। ধীরে ধীরে সেটিও আবার বড় হতে থাকে। সেই ধারাবাহিকতায় ২০১৬ সালে ১হাজার ২০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলায় আড়াইশ’ বিঘা জমির ওপর পাইওনিয়ার ডেনিম নামে কাপড় উৎপাদনের কারখানা করেন। বর্তমানে তার কারখানায় কাজ করেন ২৫ হাজার শ্রমিক। এ কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা দৈনিক প্রায় ২৬৫ টন। বর্তমানে বাদশা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের বার্ষিক টার্নওভার ৩০ থেকে ৪০ কোটি ডলার। বাদশা মিয়া কারখানায় কাজ করা এমন কয়েকজন শ্রমিক জানান, বাদশা মিয়া একজন উদার মনের মানুষ। কর্মীদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তিনি পরিশ্রম করেন। মাঝ রাতেও শ্রমিকদের সাথে এসে কাজ করেন বাদশা মিয়া। কারখানায় দিনরাত ২৪ ঘণ্টাই উৎপাদন হয়। তিনি পুরো কারখানা চক্কর দেন। উৎপাদন দেখেন। তারপর ঘুমাতে যান। বাদশা মিয়া নেতৃত্বে চাবিটা নিজের হাতে রেখে প্রতিষ্ঠানকে টেকসই করতে কর্মীদের পাশে দাড়াঁন সবসময়। বাদশা মিয়ার চার ছেলের মধ্যে দুই ছেলেকে ব্যবসায়ীকভাবে পাশে রেখেছেন। এরমধ্যে কামাল উদ্দিন আহমেদ ও মহিউদ্দিন আহমেদকে নিজের সঙ্গে রেখেছেন। তার অবর্তমানে প্রতিষ্ঠানের দেখভাল করার জন্য ইতিমধ্যে দুই ছেলে ব্যবসার সবকিছু বুঝিয়ে দিচ্ছেন। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানে করপোরেট সংস্কৃতির চর্চা গড়ে তুলছেন। পিছিয়ে নেই ইসলামী শিক্ষার সংস্কৃতি থেকে। তার নিজ গ্রাম মাদারিপুর শিবচরে প্রতিষ্ঠা করেছেন দ্বীনি খেদমতের মাদ্রাসা। যেখানে হাজার হাজার শিক্ষার্থীরা ইসলামি আদর্শে উজ্জিবীত হয়ে বেড়িয়ে যাচ্ছে ইসলামের খেদমতে। তবে নেতৃত্বে চাবিটা সব সময় নিজেরা হাতেই রাখছেন।বললেন, বেশি বেশি আরাম-আয়েশ করলে প্রতিষ্ঠান ধসে পড়ে। প্রতিষ্ঠানকে টেকসই করতে হলে কর্মীদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পরিশ্রম করতে হয়। এর বিকল্প কোনো বুদ্ধি নেই। তাই মাঝ রাতেও কারখানায় চলে আসেন বাদশা গ্রুপের কর্ণধার। অজপাড়া গাঁ থেকে উঠে আসা বাদশা গ্রুপের কর্ণধার বাদশা মিয়ার ঘাম ঝরানো প্রতিষ্ঠানটি টিকে থাক শতাব্দির পর শতাব্দি ধরে। হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হোক। কোটি মানুষের হৃদয়ে বেচেঁ থাকুক বাদশা মিয়া এমনটাই প্রত্যাশা সকলের।

Facebook Comments Box
এই জাতীয় আরও খবর
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৩ দৈনিক ফুলবাড়ীয়া সংবাদ
Theme Customized By Shakil IT Park
error: Content is protected !!